“ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে,বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।“ নদী আর নদী তীর একে অপরের সঙ্গে এতটাই সম্পৃক্ত যেমনটা কবি আর তার কবিতা । সভ্যতার ইতিহাসে নদী তীরবর্তী ঘাটগুলির বিশেষ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। হুগলি নদীর তীরবর্তী ঘাটগুলো শুধু স্নান বা পূজার স্থানই না,শহরের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ । সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এখানে স্নান করতে আসেন, উৎসব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন ঘাটকে ঘিরে, আবার ঘাট ছিল ঐতিহাসিকভাবে নৌ-পরিবহন ও পণ্য আদানপ্রদানের অন্যতম কেন্দ্র। আজও প্রায় তাই। বলা যায়, নদীর ঘাট কেবল আচার-অনুষ্ঠানের স্থান নয়, বরং শহরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও বাণিজ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক সামাজিক অঙ্গ।
Patorya Ghat in Map of 1794 : Calcutta and its Environs by Upjohn
১৭৯৪ সালে আপজন সাহেব তার ম্যাপে যখন এই ঘাটের নাম পাতরিয়া (পাথুরিয়া) লিখেছিলেন সেই সময় স্ট্যান্ড রোড তো দুরস্থান, গঙ্গার ধারের রাস্তা বলতে ছিল ধর্মাহাট্টা স্ট্রিট অধুনা মহর্ষি দেবেন্দ্র রোড। পাথুরিয়া ঘাটই কালের বিবর্তনে রুপান্তরিত হয় প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাট নামে । কিভাবে, সেই কথাতেই আসছি।
কলকাতা শহরের গঙ্গা তীরবর্তী ঘাটগুলির মধ্যে অন্যতম একটি ঘাট হল প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাট, (22.589871°N, 88.350705°E ) যা উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটায় অবস্থিত। এই ঘাটের ঠিক দক্ষিনেই অবস্থিত ঘাটটির নাম আধ্য শ্রাদ্ধ ঘাট। প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাটটির সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা আছে। আয়তকার ঘাট মন্ডপটির ছাদ পাকা ও ভেতরে কয়েকজন পান্ডার বসার জায়গা আছে। মহিলা ও পুরুষদের স্নানের জন্য পৃথক ব্যাবস্থা আছে। ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে নদীতে। এই ঘাটটির ইতিহাস যেমন পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত জমিদার পরিবার ঠাকুর পরিবারের দানশীলতার পরিচয় বহন করে, তেমনি কলকাতার এক প্রাচীন জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সাক্ষীও বটে।
ঠাকুর পরিবারের জমি ক্রয়ের ইতিহাস থেকেই ঘাট প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত ঘটে। ১৭৯০ সালে তাঁদের পরিবার পাথুরিয়াঘাটায় হুগলি নদীর ধারের চর জমি ক্রয় করেন । পরে যখন সরকার ও লটারি কমিটি স্ট্র্যান্ড রোড নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, ঠাকুর পরিবার বিনা মূল্যে সেই জমি সরকারের হাতে তুলে দেয়। তবে তখন তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, রাস্তার নিচের ঘাটটি তাঁদের পরিবারের দখলেই থাকবে। ১৮২৪ ও ১৮২৬ সালে প্রসন্ন কুমারের ভাই চন্দ্র কুমার ঠাকুর ঘাট মণ্ডপ নির্মাণের জন্য আবেদন করেন । কিন্তু তিনি জনসাধারণের জন্য ঘাট উন্মুক্ত রাখতে রাজি না হওয়ায় তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার তাঁর আবেদন অনুমোদন করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর এবং পারিবারিক বিভাজনের কারণে ঘাট নির্মাণের বিষয়টি অনেকদিন স্থগিত ছিল।
এরপরের ঘাট ধারাভাষ্যে এগুনোর পূর্বে প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের জীবন আখ্যান একটু জেনে নেয়া যাক ।প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট জমিদার গোপীমোহন ঠাকুরের পুত্র এবং খ্যাতনামা পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবারের সদস্য। তিনি ১৮০১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিন্দু কলেজে শিক্ষালাভ করেন। শিক্ষাজীবন থেকেই তিনি নাট্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ১৮৩১ সালে তিনি হিন্দু থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন, যা কোন ভারতীয়র মালিকানায় প্অরথম বাঙ্ন্তালি নাট্যমঞ্চ। নাটকের মাধ্যমে তিনি কেবল বিনোদন নয়, সমাজ সংস্কারের পথও খুঁজছিলেন। এ ছাড়াও তিনি The Reformer নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনা করতেন, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন এবং কলকাতায় আইনজীবী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর জনসেবামূলক মনোভাব ও সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ১৮৬১ সালে তাঁকে “Companion of the Order of the Star of India (C.S.I.)” খেতাবে ভূষিত করে।
১৮৫৯ সালে প্রসন্ন কুমার ঠাকুর পুনরায় সরকারের কাছে ঘাটের মন্ডপ নির্মাণের আবেদন জানান। ৫ই এপ্রিল, ১৮৫৯ তারিখে তিনি বেঙ্গলের উপ-গভর্নর স্যার জন হান্টার লিটলার-এর কাছে একটি বিস্তারিত আবেদনপত্র প্রেরণ করেন। চিঠিতে তিনি যুক্তি দেন যে, যেহেতু জমিটি তাঁদের পরিবারের ক্রয়কৃত এবং দীর্ঘদিনের দখলে, তাই সেখানে ঘাট নির্মাণের অধিকার তাঁদেরই। তিনি বলেন, পূর্বে যখন সরকার স্ট্র্যান্ড রোড নির্মাণের জন্য তাঁদের জমি নিয়েছিল, তখন শর্তসাপেক্ষে ঘাট তাঁদের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই শর্ত লঙ্ঘন করা সরকারের পক্ষে ন্যায়সঙ্গত হবে না।
প্রসন্ন কুমার তাঁর আবেদনে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থে একটি পাকা ঘাট নির্মাণ করবেন, যেখানে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পৃথক স্নানের ব্যবস্থা থাকবে। ঘাট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, কোনো রকম টোল বা শুল্ক আরোপ করা হবে না। এমনকি ভবিষ্যতে যদি সরকার রাস্তা নির্মাণ বা অন্য কোনো কারণে ঘাট স্থানান্তর করতে চায়, তবে তিনি নিজ খরচে ঘাট সরিয়ে দেবেন। তাঁর এই জনহিতকর মনোভাবকে সামনে রেখে তিনি সরকারের সদয় অনুমতির প্রার্থনা করেন।
এই আবেদনের প্রেক্ষিতে কলকাতার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট এ. জে. এম. মিলস একটি সরকারি জবাব প্রেরণ করেন। সেখানে জানানো হয় যে সরকার ঘাট নির্মাণে আপত্তি করবে না, তবে কয়েকটি শর্ত মানতে হবে। প্রথমত, ঘাটের নকশা অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হবে; দ্বিতীয়ত, ঘাট সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে; তৃতীয়ত, কোনো শুল্ক আরোপ করা যাবে না; এবং চতুর্থত, ভবিষ্যতে রাস্তা নির্মাণে বিঘ্ন ঘটলে ঘাট সরিয়ে নিতে হবে। আরও বলা হয়, যেহেতু ঘাটটি সরকারি জমির উপর নির্মিত হবে, তাই এর মালিকানা সরকারের অধীন বলেই গণ্য হবে এবং প্রয়োজনে সরকার ঘাট ভেঙে দিতে পারবে। তবে চিঠির শেষে উপ-গভর্নর প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের জনহিতকর উদ্যোগের জন্য প্রশংসা প্রকাশ করেন।
Location of P.C.Tagore Ghat on Google Map from different timeline.
১৮৫৯ সালের এই অনুমতির ফলে আবার গড়ে ওঠে পাথুরিয়া ঘাট নতুন জায়গায়। সঙ্গের গুগল ম্যাপ টি থেকে স্পষ্ট হবে অধুনা বিলুপ্ত তৎকালীন এই ঘাট টির অবস্থান ছিল মেও হসপিটালের জমির মধ্যেখানে। তার সামনেই গঙ্গা । তখনও স্ট্যান্ড ব্যাংক রোড গড়ে ওঠেনি। কিছুদিন ধরে স্নান ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হলেও, সময়ের সঙ্গে হুগলি নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় এর ব্যবহার কমে যায়। পরবর্তীকালে, কলকাতার জমিদার সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সরকারের কাছে আবেদন জানান যে, শহরের “নেটিভ হাসপাতাল” ধর্মতলার অস্বাস্থ্যকর ও অপর্যাপ্ত ভবন থেকে সরিয়ে এই ঘাট সংলগ্ন জমিতে স্থানান্তর করা হোক। তাঁদের যুক্তি ছিল, নদীর ধারে এই খোলা জায়গা স্বাস্থ্যকর, সহজলভ্য এবং রোগীদের জন্য অনেক বেশি উপযোগী যেহেতু নেটিভ জনসংখ্যার বেশিরভাগ অংশই দক্ষিণ কলিকাতার গঙ্গা তীরবর্তী এই অঞ্চলে বসবাস করে। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় যে, রাজা রাধাকান্ত দেব, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ও গোপাললাল ঠাকুর প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ইতিমধ্যেই হাসপাতালের জন্য অর্থ দান করেছেন। শেষ পর্যন্ত সরকারও স্বীকার করে যে, যেহেতু পাথুরিয়া ঘাটটি তৎকালীন সময়ে আর ব্যবহার হচ্ছিল না, তাই হাসপাতালের মতো জনসেবামূলক কাজে এর জমি ব্যবহার করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে ১৮৭০ সালের অ্যাক্ট ফাইভ অনুযায়ী কলকাতা পোর্ট কমিশনার তৈরি হয় এবং ১৮৭৪ সাল নাগাদ গঙ্গা তীরবর্তী জমির মালিকানা আসে তৎকালীন কলকাতা পোর্ট কমিশনার এর কাছে। পোর্ট কমিশনারের অনুমতিক্রমে, নেটিভ হসপিটালের গভর্নরদের অর্থে বর্তমান জায়গায় ঘাট মন্ডপ টির পুনঃ নির্মাণ হয় । ১৮৭৪ সালে সুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৭৫ সাল নাগাদ। ১৮৭৪ সালের ৬ঐ সেপ্টেম্বর লর্ড নর্থব্রুক হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। এর নতুন নামকরণ হয় মেও নেটিভ হসপিটাল।
ঘাট মন্ডপের প্রবেশপথে নয়নভিরাম অলংকৃত লোহার গেট গুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।এই ঘাটের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা না বললে এই আখ্যান অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই সেই ঘাট যেই ঘাটে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ উপলক্ষে লেখা তাঁর বিখ্যাত গান ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গাইতে গাইতে মিছিল করে এসেছিলেন আর এই ঘাটে স্নান করেই তিনি পবিত্র রাখি বন্ধন উৎসবে সূচনা করেছিলেন।
প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাট কেবল কলকাতার নগর উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ঘাটের ইতিহাসে যেমন সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি প্রতিফলিত হয় আধুনিক কলকাতার জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রচেষ্টাও। তাই আজও পাথুরিয়াঘাটার প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাট কলকাতার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং জনকল্যাণমূলক সংস্কৃতির এক স্মারক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
Click to get location of P.C.Tagore Ghat on Google Map.




.jpg)







.djvu.jpg)
















